আয়ের রাজত্বে এখনো মেসি-রোনালদো, পেছনে ছুটছেন ইয়ামাল-এমবাপ্পেরা

আয়ের রাজত্বে এখনো মেসি-রোনালদো, পেছনে ছুটছেন ইয়ামাল-এমবাপ্পেরা
আয়ের রাজত্বে এখনো মেসি-রোনালদো, পেছনে ছুটছেন ইয়ামাল-এমবাপ্পেরা
ফোর্বসের ২০২৬ সালের তালিকায় শীর্ষ দুইয়ে রোনালদো ও মেসি। ৩০ কোটি ডলার আয় নিয়ে শীর্ষে পর্তুগিজ মহাতারকা, আর ১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার নিয়ে দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
ফুটবলের রাজদণ্ড কি তবে নতুন প্রজন্মের হাতে চলে গেছে? মাঠের লড়াইয়ে লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ডদের উত্থান দেখে তেমনটা মনে হতে পারে। কিন্তু মাঠের বাইরের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য ও আয়ের দিক থেকে এখনো ফুটবল বিশ্বে রাজত্ব করছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসায়িক সাময়িকীফোর্বসপ্রকাশিত ২০২৬ সালের বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের তালিকায় যথারীতি শীর্ষ দুই স্থান দখল করেছেন এই দুই মহাতারকা। টানা চতুর্থ মৌসুমে তাঁদের নাম রয়েছে তালিকার প্রথম দুইয়ে। গত ১৩ বছরের মধ্যে ১২ বারই সর্বোচ্চ আয়কারী দুই ফুটবলার হিসেবে নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন রোনালদো ও মেসি।
মাঠে নতুন প্রজন্মের আধিপত্য বাড়লেও অর্থের খেলায় এখনো পুরোনো দ্বৈরথের দাপট। একসময় বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে যাঁদের লড়াই ফুটবল বিশ্বকে মাতিয়ে রাখত, সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চলছে আয়ের অঙ্ক ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে।
৩০ কোটি ডলার আয় রোনালদোর
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোনালদোর আনুমানিক আয় ৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে মাঠের পারিশ্রমিক থেকে আসবে ২৫ কোটি ডলার, আর মাঠের বাইরের বিভিন্ন ব্যবসা ও বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে আয় হবে আরও ৫ কোটি ডলার।
সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে বেতন ও বোনাস মিলিয়ে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাবেন পর্তুগিজ তারকা। পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের প্রচার এবং নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকেও আসবে বড় অঙ্কের আয়।

গত বছর রোনালদোর মোট আয় ছিল ২৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তাঁর আয় বেড়েছে ২ কোটি ডলার।
রোনালদোর আর্থিক সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি বোঝাতে আরও একটি তথ্য উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের শুরুতে প্রথম সক্রিয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে ক্যারিয়ারে কর বাদ দেওয়ার আগে মোট ২০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক পেরিয়েছেন তিনি।
একসময় রোনালদোর পরিচয় ছিল গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা। এখন তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও। ‘সিআর সেভেন’ ব্র্যান্ডের অধীনে বিভিন্ন পণ্য ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ পরিচালনা করেন তিনি। মাঠে গোল করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নিজের নামকে সফল ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন পর্তুগিজ তারকা।
মাঠের বাইরের আয়েই এগিয়ে মেসি
রোনালদোর মতো ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পাশাপাশি মেসির আয়ের বড় ভিত্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। বিভিন্ন ক্লাবের মালিকানায় বিনিয়োগের উদ্যোগও রয়েছে তাঁর পরিকল্পনায়।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মেসির আনুমানিক আয় ১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলে আয় করবেন প্রায় ৭ কোটি ডলার। মাঠের বাইরের বিভিন্ন চুক্তি ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে আসবে আরও সাড়ে ৭ কোটি ডলার।
অর্থাৎ মেসির ক্ষেত্রে মাঠের বাইরের আয় মাঠের আয়ের চেয়েও বেশি।

গত বছর আর্জেন্টাইন মহাতারকার আয় ছিল ১৩ কোটি ডলার। এবার তা বেড়েছে দেড় কোটি ডলার। রোনালদোর মতো মেসিও ক্যারিয়ারে মোট ২০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছেন।
দুই কিংবদন্তির ব্যবসায়িক কৌশল আলাদা হলেও ফলাফল প্রায় একই। রোনালদো নিজের নামকে কেন্দ্র করে ব্র্যান্ড ও ব্যবসা বিস্তৃত করেছেন। অন্যদিকে মেসি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
শীর্ষ দশের প্রায় অর্ধেক আয় দুই কিংবদন্তির
ফোর্বসের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ ফুটবলারের সম্মিলিত আয় প্রায় ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে রোনালদো ও মেসির আয়ই ৪৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ শীর্ষ দশের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই এই দুই তারকার দখলে।
গত বছর শীর্ষ দশ ফুটবলারের সম্মিলিত আয় ছিল প্রায় ৯৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এবার তা সামান্য কমেছে। তবে তালিকায় থাকা অধিকাংশ ফুটবলারের ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে।
সম্মিলিত আয় কমার অন্যতম কারণ, গত বছরের তালিকায় থাকা ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা এবার শীর্ষ দশে নেই। গত বছর তাঁর আনুমানিক আয় ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আল হিলালের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর বর্তমানে তিনি ফ্রি এজেন্ট। তাঁর জায়গায় তালিকার নবম স্থানে উঠে এসেছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন।
তিন নম্বরে এমবাপ্পে, পেছনে হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস
মেসি-রোনালদোর আধিপত্যের মাঝেও নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের উত্থান স্পষ্ট। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে।
রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা ফোর্বসের ২০২৬ সালের তালিকায় এক ধাপ এগিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠেছেন। তাঁর আনুমানিক আয় ১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে মাঠের পারিশ্রমিক থেকে ৭ কোটি ডলার এবং মাঠের বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে ৩ কোটি ডলার আসবে। গত বছরের তুলনায় তাঁর আয় বেড়েছে ৫০ লাখ ডলার।
তবে মেসি-রোনালদোর সিংহাসন যে একেবারেই অপ্রবেশযোগ্য নয়, তা আগেই দেখিয়েছেন এমবাপ্পে। ২০২২ সালে পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়নের সময় বিশাল অঙ্কের সাইনিং বোনাস পেয়ে সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলার হয়েছিলেন তিনি। যদিও সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।
তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। তাঁর আনুমানিক আয় ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ক্লাবের বেতন ও বোনাস থেকে ৬ কোটি ডলার এবং মাঠের বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে আড়াই কোটি ডলার আসবে।
পঞ্চম স্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাঁর আনুমানিক আয় ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

এমবাপ্পে, হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস—তিনজনই ফুটবলের সেরা সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বাড়ছে তাঁদের বাণিজ্যিক মূল্যও। ভবিষ্যতে মেসি-রোনালদোর আয়ের রাজত্বে ভাগ বসানোর দৌড়ে আপাতত তাঁরাই অন্যতম দাবিদার।
ইয়ামালের উত্থান, আয় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার
নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই তরুণ তারকা মাঠে যেমন দ্রুত নিজের অবস্থান শক্ত করছেন, তেমনি মাঠের বাইরেও গড়ে তুলছেন বাণিজ্যিক পরিচিতি।
আমেরিকান ঈগল, কোকা-কোলা ও ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্পনসরশিপ চুক্তি করেছেন তিনি। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইয়ামালের আনুমানিক আয় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ষষ্ঠ।
গত বছর তাঁর আয় ছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার।
বয়সের তুলনায় এই আয় নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। যে বয়সে অনেক ফুটবলার মূল দলে নিয়মিত জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে থাকেন, সেই বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের একজন হয়ে উঠেছেন।
প্রজন্ম বদলাচ্ছে, কিন্তু আর্থিক রাজত্ব এখনো পুরোনোদের
একসময় মেসি ও রোনালদোর লড়াইয়ের মূল প্রশ্ন ছিল—কে বেশি গোল করবেন, কে বেশি ব্যালন ডি’অর জিতবেন, আর কে হবেন সর্বকালের সেরা? সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র কিছুটা বদলেছে। এখন মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে তাঁদের আয়, স্পনসরশিপ ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।

অন্যদিকে ইয়ামাল, এমবাপ্পে ও হলান্ডদের মতো তারকারা মাঠের সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্যিক অবস্থানও শক্তিশালী করছেন। তাঁদের সামনে রয়েছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং আয় বাড়ানোর আরও অনেক সুযোগ।
ফুটবলে প্রজন্মের পালাবদল শুরু হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ফোর্বসের ২০২৬ সালের হিসাব বলছে, আয়ের রাজত্বে এখনো মেসি-রোনালদোর যুগ শেষ হয়নি। মাঠের সিংহাসনে নতুন রাজা আসতে পারেন, তবে ফুটবলের আর্থিক সাম্রাজ্যে দুই পুরোনো সম্রাটের আধিপত্য এখনো অটুট।














