দুঃস্বপ্নে শুরু, অমরত্বের স্বাদে শেষ: মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
- 1
এক গোল, দুই অ্যাসিস্টে আন্তর্জাতিক বিদায় রাঙালেন মেসি
- 2
মেসির বিদায়ে আপ্লুত নেইমার, ‘তোমার সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হতে পারা সম্মানের’
- 3
‘আমরা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলাম’, বিশ্বকাপ ফাইনালে হার নিয়ে মুখ খুললেন মেসি
- 4
এক রকেটে ১৫ স্যাটেলাইট, মহাকাশে নতুন রেকর্ড গড়ল দক্ষিণ কোরিয়া
- 5
ডোসায় মৃত ইঁদুরের অভিযোগ, এরপরই ২৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ—মুম্বাইয়ে চাঞ্চল্য

দুঃস্বপ্নে শুরু, অমরত্বের স্বাদে শেষ: মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
দুঃস্বপ্নে শুরু, অমরত্বের স্বাদে শেষ: মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
যতটা বার্সেলোনার আপন ছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ততটাই যেন আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ছিলেন দূরের। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের জার্সিতে শিরোপার দেখা পাচ্ছিলেন না লিওনেল মেসি। একসময় তাই নিজ দেশের মানুষের কাছেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরও নিয়েছিলেন। কিন্তু অবসর ভেঙে ফেরার পর যেন নতুন এক মেসির জন্ম হয়। একের পর এক রেকর্ড, শিরোপা আর ইতিহাস গড়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে যান ফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে।
২০২২ বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নিয়ে পূরণ করেন আজন্মের স্বপ্ন। এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও শিরোপা জিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
দুঃস্বপ্নের অভিষেক থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, হতাশা থেকে অমরত্ব—আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের যাত্রাটা যেন এক মহাকাব্য। বিদায়বেলায় ফিরে দেখা যাক সেই দীর্ঘ পথচলা।
২০০৫: দুঃস্বপ্নের অভিষেক
হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় ১৮ বছর বয়সী মেসির। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচটি মোটেও সুখকর ছিল না।
পুসকাস অ্যারেনায় ৬৩ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র ৪৪ সেকেন্ড পরই লাল কার্ড দেখেন মেসি। হাঙ্গেরির ভিলমোস ভান্সজ্যাকের মুখে অনিচ্ছাকৃতভাবে কনুই লাগায় তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির যাত্রা শুরু হয়েছিল তাই এক দুঃস্বপ্নের রাত দিয়ে।
২০০৬: বিশ্বকাপে অভিষেক
অভিষেকের এক বছরের মধ্যেই বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন মেসি। সার্বিয়ার বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ের ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় তাঁর।
শুধু অভিষেকই নয়, সেই ম্যাচে গোলও করেন মেসি। এর মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসে লেখান তিনি।
২০০৮: অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে ক্যারিয়ারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদ পান মেসি।
ফাইনালে নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে আর্জেন্টিনা। সেই সাফল্যের অংশ ছিলেন তরুণ মেসি।
২০১০–২০১১: হতাশার পর হতাশা
২০০৯ সালে আর্জেন্টিনার আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি পাওয়ার পর বিশ্বমঞ্চে মেসির ওপর প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১১ কোপা আমেরিকা—দুই টুর্নামেন্টেই আর্জেন্টিনার পথচলা থামে কোয়ার্টার ফাইনালে।
ব্যক্তিগতভাবেও সময়টা কঠিন ছিল মেসির জন্য। দুই টুর্নামেন্ট মিলিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো গোল করতে পারেননি তিনি।
২০১৪–২০১৬: ফাইনাল, রেকর্ড আর অভিমানের অবসর
২০১৪ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান মেসি। তাঁর নেতৃত্বে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
কিন্তু মারিও গোটশের অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। পরপর দুই বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালেও একই হতাশা। ২০১৫ ও ২০১৬—দুই আসরেই চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারার পর হতাশা ও অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি।
তবে অবসর তাঁর শেষ কথা হয়ে থাকেনি।
২০১৮–২০২১: প্রত্যাবর্তন ও দায়মোচন
২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জিততেই হতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে দলকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন মেসি।
রাশিয়া বিশ্বকাপে অবশ্য আর্জেন্টিনার পথচলা থামে শেষ ষোলোতেই।
এরপর শুরু হয় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়। ২০২১ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন তিনি। তাতে শেষ হয় ২৮ বছরের শিরোপাখরা।
একই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েন মেসি।
২০২২–২০২৪: আজন্ম স্বপ্নপূরণ ও কোপায় রাজত্ব
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসানের পাশাপাশি পূরণ হয় মেসির আজন্মের স্বপ্ন।
পুরো টুর্নামেন্টে সাত গোল করে গোল্ডেন বল জেতেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দ্বিতীয়বার এই পুরস্কার জিতে অনন্য রেকর্ড গড়েন।
এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। একের পর এক শিরোপায় নিজের আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারকে আরও উজ্জ্বল করে তোলেন তিনি।
২০২৬: ‘মেসি যুগের’ অবসান
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামে আর্জেন্টিনা। আরেকবার দলকে ফাইনালে তোলেন মেসি।
তবে শেষ বাধায় স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপে ২১ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও গড়েছিলেন মেসি। পরে অবশ্য কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল করে সেই রেকর্ড নিজের করে নেন।
বিশ্বকাপের হতাশার পর আরও এক ব্যক্তিগত শোক নেমে আসে মেসির জীবনে। ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসিকে হারান তিনি। এর ২৩ দিন পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তবে আর্জেন্টিনার অনুরোধে আরও একবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে সেই ম্যাচেই গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে ৩-০ গোলের জয় এনে দেন দলকে।
আর সেখানেই পর্দা নামে আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের।
দুঃস্বপ্ন থেকে অমরত্ব
২০০৫ সালে লাল কার্ড দিয়ে যে যাত্রার শুরু, ২১ বছর পর সেটির শেষ হলো গোল, অ্যাসিস্ট, জয় আর কোটি মানুষের ভালোবাসায়।
একসময় আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে শিরোপাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মেসি। সেই মেসিই পরে দেশকে কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা ও বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি পূরণ হওয়ার পর আর কিছুই যেন বাকি ছিল না। তাই মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুধু একটি ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়—এটি ব্যর্থতা, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তন, অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত অমরত্বের গল্প।
দুঃস্বপ্নে শুরু হয়েছিল যে অধ্যায়, তার শেষ হলো কিংবদন্তির মর্যাদায়।














