Image

নানা পাটেকারের জীবনের অজানা ১০ তথ্য | সংগ্রাম, পরিবার ও অভিনয়

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 1 ঘন্টা আগেআপডেট: 53 মিনিট আগে
নানা পাটেকারের জীবনের অজানা ১০ তথ্য | সংগ্রাম, পরিবার ও অভিনয়

নানা পাটেকারের জীবনের অজানা ১০ তথ্য | সংগ্রাম, পরিবার ও অভিনয়

নানা পাটেকারের জীবনের অজানা ১০ তথ্য | সংগ্রাম, পরিবার ও অভিনয়

নানা পাটেকারের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে। ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বর্ষীয়ান এই অভিনেতা। গোয়ার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসকদের একটি দল সেখানে পৌঁছায়। পরে তাকে দোনা পাউলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকার। তবে পর্দার বাইরের জীবনও ছিল সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত শোক এবং নানা বৈচিত্র্যে ভরা।

দুই ভাই অশোক ও দিলীপের সঙ্গে শৈশব কাটে তার। পরে পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে যান। আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সেই শিশুটিই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা। তার জীবনের এমনই কিছু অজানা অধ্যায় তুলে ধরা হলো।

১. আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার

নানা পাটেকারের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুড-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলায় পাওয়া ‘নানা’ ডাকনামটিই পরবর্তী সময়ে তার পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।

২. মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কাজ শুরু

অভিনেতা হওয়ার অনেক আগেই জীবিকার জন্য কাজ করতে হয়েছিল নানাকে। প্রায় ১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ শুরু করেন তিনি।

সেই কাজ থেকে মাসে মাত্র ৩৫ রুপি আয় করতেন। কর্মস্থলে যেতে কয়েক কিলোমিটার হেঁটেও যেতে হতো তাকে। পোস্টার আঁকার পাশাপাশি জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছেন নানা।

পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সেই বয়সের ক্ষুধা, অভাব ও অপমান তাকে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। বাস্তব জীবনের সেই অভিজ্ঞতা তার অভিনয়জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

৩. অভিনয়ের শুরুর দিনে স্ত্রী ছিলেন বড় সমর্থন

১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকারকে বিয়ে করেন নানা। নীলকান্তি তখন ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং নানার তুলনায় আর্থিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছল ছিলেন।

নানার অভিনয়জীবনের শুরুতে থিয়েটার থেকে আয় ছিল খুবই কম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নাটকের জন্য প্রায় ৫০ রুপি পেতেন তিনি। অন্যদিকে তার স্ত্রী মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০ রুপি আয় করতেন।

নিজের পছন্দের অভিনয় চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন নানা। সেই সময় নীলকান্তি তাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, তিনি যে কাজ বিশ্বাস করেন সেটিই যেন করে যান—একসময় সেখান থেকেই অর্থ আসবে।

পরবর্তী সময়ে দুজন আলাদা থাকলেও আইনগতভাবে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।

৪. আড়াই বছর বয়সেই হারান বড় ছেলেকে

নানার ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বড় ছেলে দুর্বাসার মৃত্যু। প্রায় আড়াই বছর বয়সে মারা যায় তার ছেলে। জন্মের পর থেকেই দুর্বাসা অসুস্থ ছিল এবং তার বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল বলে জানা যায়।

বহু বছর পর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নানা স্বীকার করেছিলেন, সন্তানের অসুস্থতার সময় শুরুতে সন্তানের কষ্টের চেয়ে মানুষ কী ভাববে, সেটি নিয়েই বেশি চিন্তা করতেন। পরবর্তী সময়ে এই উপলব্ধি তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

দুর্বাসার মৃত্যুর পর নানা ও নীলকান্তির আরেক ছেলে হয়। তার নাম মালহার পাটেকার।

৫. দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন

একসময় ধূমপানের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত ছিলেন নানা। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন।

দিনের প্রায় সব সময়ই ধূমপান করতেন তিনি। এমনকি গোসলের সময়ও সিগারেট খাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তার গাড়িতে সিগারেটের গন্ধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে মানুষ সেখানে বসতেও চাইত না বলে জানিয়েছিলেন নানা।

৬. অভিনয়ের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও ছিল ভালোবাসা

সিনেমার বাইরের জীবনে রান্না করা ছিল নানার অন্যতম পছন্দের কাজ। শুধু রান্না করাই নয়, অন্যদের খাওয়াতেও আনন্দ পেতেন তিনি।

২০১৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, শুটিংয়ের সময় কখনো কখনো পুরো চলচ্চিত্র ইউনিটের জন্য রান্না করতেন। একটি ইউনিটে প্রায় ১১০ জন থাকলেও তাদের জন্য রান্না করার অভিজ্ঞতা ছিল তার।

রান্নার প্রতি নিজের ভালোবাসা বোঝাতে নানা এমনও বলেছিলেন, অভিনেতার চেয়ে তিনি নিজেকে ভালো রাঁধুনি মনে করেন।

৭. কৃষিকাজের সঙ্গেও ছিল গভীর সম্পর্ক

চলচ্চিত্রের ব্যস্ত জীবনের বাইরে কৃষিকাজের প্রতিও নানার ছিল গভীর আগ্রহ। মহারাষ্ট্রের সিংহগড় দুর্গের কাছে তার একটি খামার ছিল।

সেখানে ধান, বাদাম, রসুন ও পেঁয়াজ চাষ করতেন তিনি। কৃষিকাজের প্রতি তার আগ্রহ শুধু ব্যক্তিগত শখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও কাজ করেছেন নানা।

খরাপ্রবণ মহারাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তায় তার প্রতিষ্ঠিত নাম ফাউন্ডেশনও কাজ করেছে।

৮. সিনেমার চরিত্রের বাইরেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক

সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বাস্তব জীবনেও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নানা পাটেকার।

১৯৯১ সালের ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমায় অভিনয়ের আগে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে কমিশন পান এবং মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের সেবা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯. ছেলেকে সরাসরি অভিনেতা বানাননি

নানার ছেলে মালহার পাটেকারেরও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল। তবে বাবার তারকা পরিচয় ব্যবহার করে তাকে সরাসরি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথে হাঁটেননি নানা।

জানা যায়, নানা নিজেই ‘আব তাক ছাপ্পান’-এর একটি সিক্যুয়েল পরিচালনার পরিকল্পনা করছিলেন। সেখানে মালহারের অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হলেও নানা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।

পরে মালহার অভিনয়ের বদলে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে এগিয়ে যান। তিনি পরিচালক রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।

১০. সংগ্রামই তৈরি করেছিল তার আলাদা পরিচয়

শৈশবের আর্থিক সংকট, অল্প বয়সে কাজ শুরু, থিয়েটারের কঠিন দিন, সংসার ও ব্যক্তিগত শোক—সবকিছু পেরিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকার।

অভিনয়ের পাশাপাশি রান্না, কৃষিকাজ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কও দেখায়, পর্দার বাইরেও কতটা বৈচিত্র্যময় ছিল তার জীবন। নিজের পছন্দের কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাই তাকে তৈরি করেছিল বলিউডের অন্যতম স্বতন্ত্র অভিনেতা হিসেবে।

নানা পাটেকারের জীবন তাই শুধু চলচ্চিত্রের সাফল্যের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, হারানো, ঘুরে দাঁড়ানো এবং নিজের বিশ্বাসের পথে এগিয়ে চলার গল্পও।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three