Image

স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং: এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 9 ঘন্টা আগেআপডেট: 29 মিনিট আগে
স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং: এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং: এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং: এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

 

একটি স্যান্ডউইচের গোল রুটি, একজন দোকানদারের সঙ্গে বিরোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ব্যঙ্গাত্মক মিম—সেখান থেকে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’। আর সেই মিমের সূত্র ধরেই এবার চীনের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সে–তুংয়ের প্রসঙ্গ, চীনা ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল, লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাওয়ার ঘটনায় জড়ালেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।

ফরাসি তারকার একটি পুরোনো পডকাস্ট মন্তব্য চলতি সপ্তাহে নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর চীনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এমবাপ্পে নিজে ক্ষমা চেয়েছেন, ক্ষমা চেয়েছে লা লিগাও। এরপর রিয়াল মাদ্রিদও চীনের জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।

শুরুটা হয়েছিল একটি স্যান্ডউইচকে ঘিরে

‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিমের গল্পের শুরু ২০২৪ সালে ফ্রান্সে। মার্শেইয়ের ইনফ্লুয়েন্সার ও খাবারের দোকানের মালিক মোহাম্মদ হেন্নি তাঁর দোকানের একটি স্যান্ডউইচের বর্ণনায় এমবাপ্পের নাম ব্যবহার করেছিলেন। স্যান্ডউইচটির গোলাকার রুটির সঙ্গে তিনি তুলনা করেছিলেন এমবাপ্পের মাথার আকৃতি।

বর্ণনায় বলা হয়েছিল, রুটিটি ছিল ‘এমবাপ্পের মাথার মতোই গোল’।

এতে আপত্তি জানায় এমবাপ্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কেএমএ। আইনজীবীর মাধ্যমে হেন্নিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্যান্ডউইচের বর্ণনা থেকে এমবাপ্পের নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। না হলে আইনি পদক্ষেপের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনাটি নিয়ে হেন্নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। এত ছোট একটি বিষয় নিয়ে ফুটবল তারকার পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের হুমকি কেন—সেই প্রশ্ন তুলতে গিয়ে এমবাপ্পের আচরণকে ‘ডিক্টেটর’-সুলভ বলে ব্যঙ্গ করেন তিনি। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিমের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

ফুটবলের ক্ষমতা থেকে ‘ডিক্টেটর’ চরিত্র

তবে শুধু স্যান্ডউইচের ঘটনা দিয়ে এই মিমের জনপ্রিয়তা ব্যাখ্যা করা যায় না।

২০২২ সালে পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তির পর এমবাপ্পের ক্লাবের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। খেলোয়াড় কেনাবেচা, কোচ নিয়োগ এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

সেই আলোচনাকে অতিরঞ্জিত করে সমর্থক ও মিম নির্মাতারা এমবাপ্পেকে এমন এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন, যেন ক্লাবের সব সিদ্ধান্তই তাঁর হাতে।

কখনো সামরিক পোশাকে, কখনো সিংহাসনে বসা শাসকের বেশে দেখা যায় তাঁকে। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতার অবয়বের সঙ্গে এমবাপ্পের মুখ জুড়ে মিম তৈরি হতে থাকে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এসব মিম মূলত ফুটবলে এমবাপ্পের কথিত প্রভাব নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য তৈরি হয়েছিল।

মিম নিয়ে এমবাপ্পের নিজেরও অস্বস্তি ছিল

মজার বিষয় হলো, ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিম নিয়ে খোদ এমবাপ্পেরও পুরোপুরি স্বস্তি ছিল না।

সেপ্টেম্বরে ফরাসি ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম L’Équipe-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, মিমের একটি অংশ মজার হলেও ইতিহাসের ভয়াবহ স্বৈরশাসকদের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করার বিষয়টি তাঁর ভালো লাগে না।

তাঁর যুক্তি ছিল, এসব চরিত্র ইতিহাসে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তাঁদের সঙ্গে একজন ফুটবলারের তুলনা করা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর।

কিন্তু সেই মিম নিয়েই কয়েক মাস আগের একটি মন্তব্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে বড় ধরনের বিতর্কে ফেলেছে।

মাও সে–তুংয়ের ছবি থেকেই নতুন বিতর্ক

ফরাসি ফুটবল পডকাস্ট The Bridge-এর একটি সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পেকে তাঁর সবচেয়ে মজার মিম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল।

জবাবে তিনি এমন একটি ভিডিওর কথা বলেন, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। এমবাপ্পে সরাসরি নাম না বললেও ভিডিওতে যে ব্যক্তির অবয়ব দেখা যাচ্ছিল, সেটি ছিল চীনের সাবেক নেতা মাও সে–তুংয়ের।

ভিডিওটি পরে সরিয়ে নেওয়া হলেও চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা আবার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। Reuters জানিয়েছে, তারা ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি; তবে এমবাপ্পের পরবর্তী ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্যে তিনি মন্তব্যটি ‘বিবেচনাহীন’ বলে স্বীকার করেন।

কেন মাওকে নিয়ে মন্তব্য এত সংবেদনশীল?

চীনে মাও সে–তুং অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন।

চীনের সরকারি ইতিহাসে তিনি প্রতিষ্ঠাতা নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন নীতি, বিশেষ করে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে।

তাই মাওকে নিয়ে ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপ চীনে সাধারণ রাজনৈতিক রসিকতার মতো বিষয় নয়। এমবাপ্পের কাছে মন্তব্যটি নিজের একটি মিম নিয়ে হাস্যরস হলেও চীনে সেটি দ্রুত অন্য অর্থ পেতে শুরু করে।

ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর এমবাপ্পে ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় ক্ষমা চান।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের একটি ছবি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি ভুল মন্তব্য করেছেন। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর বক্তব্য চীনের অনেক মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের মানুষকে কষ্ট দিয়েছে।

এমবাপ্পে স্পষ্ট করে বলেন, কাউকে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না এবং চীনের জনগণ ও তাদের ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।

একে একে সরে গেল চীনা ব্র্যান্ড

ক্ষমা চাওয়ার আগেই অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে বড় ধাক্কা খেতে শুরু করেন এমবাপ্পে।

চীনের বড় প্রতিষ্ঠান Mengniu, Shanghai Milkground Food Tech এবং Eastroc Beverage তাঁর সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে—এমন বক্তব্য বা আচরণের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কঠোর।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতেও এমবাপ্পেকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তাঁর মন্তব্যের প্রতিবাদে নানা প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।

চীনে লা লিগা সম্প্রচারেও প্রভাব

বিতর্কের সবচেয়ে বড় দিকগুলোর একটি হলো, বিষয়টি শুধু এমবাপ্পের ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার প্ল্যাটফর্মগুলো এমবাপ্পে ও লা লিগাকে ঘিরে সম্প্রচারে পদক্ষেপ নেয়। Reuters জানিয়েছে, Migu রিয়াল মাদ্রিদের আসন্ন লা লিগা ম্যাচ সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয়। চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের ক্ষেত্রেও লা লিগার সম্প্রচার নিয়ে স্থগিতাদেশের খবর প্রকাশিত হয়।

এর ফলে বিষয়টি আর শুধু একজন ফুটবলারের বিতর্ক হিসেবে থাকেনি; স্প্যানিশ ফুটবলের চীনা বাজারে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগারও ক্ষমা

এমবাপ্পের পর লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও চীনা সমর্থকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। লা লিগা জানায়, মন্তব্যটি এমবাপ্পের ব্যক্তিগত এবং এটি লিগের অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে না। একই সঙ্গে চীনা অংশীদারদের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।

এরপর ২৮ অক্টোবর রিয়াল মাদ্রিদও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। ক্লাবটি জানায়, এমবাপ্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার জন্য তারা দুঃখিত এবং চীন, দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের প্রতি ক্লাবের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।

একটি মিম কীভাবে আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিল?

গল্পটির শুরু হয়েছিল একটি স্যান্ডউইচের নাম নিয়ে মজা থেকে। এরপর ফুটবলে এমবাপ্পের প্রভাব নিয়ে তৈরি হয় ‘ডিক্টেটর’ মিম। সেই মিমেরই একটি সংস্করণে মাও সে–তুংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়।

এমবাপ্পে সেই মিমকে নিজের সবচেয়ে মজার মিমগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু চীনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মন্তব্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি করে।

ফলাফল—ক্ষমা চাওয়া, চীনা ব্র্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন, লা লিগা সম্প্রচার নিয়ে অস্থিরতা এবং শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদকেও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামতে হয়েছে।

একটি ফুটবল মিম যে এত দূর গড়াতে পারে, ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ বিতর্ক তারই বিরল উদাহরণ।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three