রাহুল দ্রাবিড়ের চোখে জ্যাক ক্যালিসের শ্রেষ্ঠত্ব: কেন তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা
- 1
এআই দিয়ে বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি নিয়ে ক্ষুব্ধ মেহজাবীন
- 2
৪০০ পরিবারের দায়িত্ব নিলেন রাশমিকা, টানা এক বছর সহায়তার পরিকল্পনা
- 3
অপু বিশ্বাসের ‘বিজনেস মেন্টর’ কে, জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তায় যা জানালেন অভিনেত্রী
- 4
বাহকোলার হ্যাটট্রিকে এলএএসকে উড়িয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে লিভারপুলের ৬-৩ জয়
- 5
৭ মিনিটের ঝড়ে রোমাকে হারিয়ে রেয়াল মাদ্রিদের রোমাঞ্চকর জয়

রাহুল দ্রাবিড়ের চোখে জ্যাক ক্যালিসের শ্রেষ্ঠত্ব: কেন তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা
রাহুল দ্রাবিড়ের চোখে জ্যাক ক্যালিসের শ্রেষ্ঠত্ব: কেন তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা
ক্রিকেটের ইতিহাসে অলরাউন্ডার কম আসেননি। কিন্তু জ্যাক ক্যালিস ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। অন্য অনেক গ্রেট অলরাউন্ডারের মতো নিচের দিকে ব্যাটিং নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে তিনি নিয়মিত টপ অর্ডারে ব্যাট করেছেন। দীর্ঘ সময় ছিলেন দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। একই সঙ্গে বল হাতেও ছিলেন কার্যকর ও ভয়ংকর এক পেসার।
ক্যালিসকে নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়। তাঁর চোখে ক্যালিসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং ও মানসিক দৃঢ়তা; সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মান ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা।
টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যান, অথচ কার্যকর পেসার
দক্ষিণ আফ্রিকার পেস বোলিংয়ের গভীরতার কারণে ক্যালিসকে নিয়মিত বেশি বল করতে হয়নি। টেস্টপ্রতি গড়ে প্রায় ২০ ওভার বল করলেও তিনি কখনোই সাদামাটা বোলার ছিলেন না।
সুইং, সিম, নিয়ন্ত্রণ, ভয়ংকর বাউন্সার—সবই ছিল তাঁর অস্ত্রভান্ডারে। দলের প্রয়োজন হলে গতি বাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্যও ছিল। দ্রাবিড়ের মতে, ক্যালিস যদি এতটা ওপরে ব্যাট না করতেন, তাহলে হয়তো তাঁর ক্যারিয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা পেসার হিসেবেও শেষ হতে পারত।
শান্ত স্বভাবের আড়ালে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী
মাঠে ক্যালিস ছিলেন মিতভাষী, মাঠের বাইরেও অনেকটা অন্তর্মুখী। তবে আইপিএলের শুরুর দিকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুতে একসঙ্গে খেলার সময় দ্রাবিড় কাছ থেকে বুঝেছিলেন, ক্যালিস আসলে বেশ খোলামেলা ও মিশুক মানুষ। শুধু নিজের মতো থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, সে বিষয়ে ক্যালিসের ধারণা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। অনুশীলনের ধরন দেখেই বোঝা যেত, নিজের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই মানে পৌঁছানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতেন।
দ্রাবিড়ের চোখে ক্যালিসের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল এখানেই—সবকিছু বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হতো, ভেতরে তিনি ছিলেন ততটাই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী।
কঠিন পরিস্থিতিতে খেলাটা বদলে নেওয়ার ক্ষমতা
টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে ক্যালিস তখন প্রতিষ্ঠিত তারকা। কিন্তু আইপিএলে শুরুটা প্রত্যাশামতো ভালো হয়নি। দর্শকদের কাছে টি-টোয়েন্টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সেই বয়সেও নিজেকে নতুন সংস্করণের ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
দ্রাবিড় বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্যালিসের খেলার গতি বদলে ফেলার ক্ষমতাকে।
কঠিন কন্ডিশনে প্রয়োজন হলে রক্ষণাত্মক ব্যাটিং করতেন। আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে বোলারকে চাপে ফেলতে এক মুহূর্তও দেরি করতেন না।
২০১১ সালে কেপটাউনে ভারতের বিপক্ষে এর বড় উদাহরণ দেখা যায়। কঠিন পিচে হরভজন সিংয়ের বিপক্ষে রিভার্স সুইপসহ সাহসী শট খেলেছিলেন ক্যালিস এবং সেই ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। দ্রাবিড়ের ভাষ্যে, ভারত দুবার সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে কেপটাউনে গিয়েছিল, আর দুবারই সেই স্বপ্ন ভাঙার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ক্যালিসের।
১৮ বছর ধরে ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্ব
ক্যালিসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বিস্তৃত ছিল প্রায় ১৮ বছর। এর মধ্যে ১৩ বছরই কেটেছে এই শতাব্দীতে। এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব।
স্লিপে ফিল্ডিং করার সময় প্রতিটি বলেই সর্বোচ্চ মনোযোগ প্রয়োজন। তার ওপর একজন পেস বোলার হিসেবে নিয়মিত বল করা এবং টপ অর্ডারে ব্যাটিং করা—সব মিলিয়ে ক্যালিসের মানসিক ও শারীরিক শক্তির ভান্ডার ছিল অসাধারণ।
দ্রাবিড়ের মতে, এর পেছনে ছিল ক্রিকেটের প্রতি ক্যালিসের গভীর ভালোবাসা।
ফিটনেস ছিল সহজাত, অনুশীলন ছিল দক্ষতাকেন্দ্রিক
দ্রাবিড় জানিয়েছেন, ম্যাচের পর তাঁকে ফিট থাকতে আইস বাথসহ বিভিন্ন রিকভারি রুটিন অনুসরণ করতে হতো। কিন্তু ক্যালিসের ক্ষেত্রে এসবের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তাঁর দুর্দান্ত শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই ছিল প্রকৃতিপ্রদত্ত।
অবশ্য ক্যালিস ছোটবেলা থেকেই জিম ও ফিটনেস ট্রেনিং করতেন এবং এ ক্ষেত্রে বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন বড় উৎসাহ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুশীলন আরও দক্ষতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতিটি সেশনেই ব্যাটিং, বোলিং এবং ক্যাচিং অনুশীলন করতেন।

কেন ক্যালিসকে আটকানো এত কঠিন ছিল?
দ্রাবিড়ের মতে, ক্যালিস ছিলেন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ একজন ব্যাটসম্যান। সব ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষে খেলতে পারতেন এবং দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থাকার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
তাঁর ব্যাটিংয়ে দৃশ্যমান কোনো বড় দুর্বলতা ছিল না। নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা করে তাঁকে সহজে আটকে রাখা যেত না।
ইনিংসের শুরুতে অফ স্টাম্প লক্ষ্য করে ফুল লেংথে বল করে তাঁর ব্যাট মিস করানোর চেষ্টা করতে হতো। কিন্তু একবার সেট হয়ে গেলে তাঁকে আউট করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি খুব কম ভুল করতেন। তাই ক্যালিসকে ফেরাতে বোলারকে প্রায় নিখুঁত বল করতে হতো—যা শারীরিক ও মানসিকভাবে বোলারের ওপর বড় চাপ তৈরি করত।
দ্রাবিড়ের তুলনায়, ক্যালিসের বিপক্ষে খেলা ছিল যেন একজন দুর্দান্ত টেনিস খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হওয়া। ব্যাটিংয়ের সময় প্রচুর ভালো বল করতে হতো, আবার বোলিংয়ের সময় তাঁর কাছ থেকে আসত অসাধারণ সব শট।
এই শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটার ক্যালিস
ক্রিকেটারদের নিয়ে গঠিত জুরি প্যানেল যখন জ্যাক ক্যালিসকে এই শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটার হিসেবে নির্বাচিত করেছিল, তখন দ্রাবিড় মোটেও অবাক হননি।
কারণ, সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্যালিস যা অর্জন করেছেন, তার কঠিনত্ব অন্য ক্রিকেটারদের চেয়ে ক্রিকেটাররাই ভালো বুঝতে পারেন।
দ্রাবিড়ের নিজের ব্যাটিং ক্যারিয়ারও ক্যালিসের সঙ্গে অনেকটা তুলনীয়। ক্যালিস খেলেছেন দ্রাবিড়ের চেয়ে দুটি টেস্ট বেশি এবং করেছেন মাত্র এক রান বেশি। দুজনেই মূলত টপ অর্ডারে ব্যাট করেছেন এবং স্লিপে ফিল্ডিং করেছেন। দ্রাবিড় ক্যালিসের চেয়ে ১০টি ক্যাচ বেশি নিয়েছেন।
কিন্তু পার্থক্যটা তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়ের পাশাপাশি ক্যালিস ছিলেন একজন পেস বোলারও। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ২৯২টি উইকেট রয়েছে।
অর্থাৎ, একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে যে চারটি বড় দক্ষতা—ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং ও মানসিক দৃঢ়তা—প্রত্যাশা করা হয়, ক্যালিস চারটিতেই ছিলেন অসাধারণ।
রাহুল দ্রাবিড়ের চোখে তাই জ্যাক ক্যালিস শুধু একজন গ্রেট অলরাউন্ডার নন; তিনি এমন একজন ক্রিকেটার, যার খেলায় প্রায় কোনো দৃশ্যমান দুর্বলতা ছিল না।












