Image

সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনা হলেই ‘বুড়ি’—নারী তারকার জন্য কেন আলাদা মাপকাঠি?

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 4 ঘন্টা আগেআপডেট: 1 ঘন্টা আগে
সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনা হলেই ‘বুড়ি’—নারী তারকার জন্য কেন আলাদা মাপকাঠি?

সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনা হলেই ‘বুড়ি’—নারী তারকার জন্য কেন আলাদা মাপকাঠি?

সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনা হলেই ‘বুড়ি’—নারী তারকার জন্য কেন আলাদা মাপকাঠি?

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দর্শকের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। বিয়ে, সন্তান, নতুন সিনেমা কিংবা চেহারার পরিবর্তন—বলিউড তারকাদের জীবনের প্রায় সবকিছুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে সেই আলোচনায় একটি বৈপরীত্যও বারবার চোখে পড়ে। একই ধরনের ঘটনা পুরুষ তারকার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হলেও নারী তারকাকে ঘিরে শুরু হয় প্রশ্ন, কটাক্ষ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ।

বয়স বাড়া, শরীরের পরিবর্তন, মা হওয়ার সিদ্ধান্ত, সিনেমার অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় কিংবা স্বামীর ক্যারিয়ারে খারাপ সময়—বিভিন্ন ঘটনায় এই দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ মিলেছে বলিউডের একাধিক তারকার ক্ষেত্রে।

মা হওয়ার পর ক্যাটরিনার চেহারা নিয়েও ট্রল

ক্যাটরিনা কাইফ ও ভিকি কৌশল ২০২১ সালে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালে তাঁদের ঘরে আসে ছেলে ভিহান। সন্তান জন্মের পর স্বাভাবিকভাবেই ক্যাটরিনার শরীর ও চেহারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

ক্যাটরিনা প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর পুরোনো ও সাম্প্রতিক ছবি পাশাপাশি রেখে অনেকে তুলনা করেন। ওজন ও চেহারার পরিবর্তন নিয়েও করা হয় কটাক্ষ। অথচ সময়ের সঙ্গে ভিকি কৌশলের চেহারাতেও পরিবর্তন এসেছে। তাঁকে একই ধরনের মন্তব্যের মুখে পড়তে দেখা যায়নি।

ক্যাটরিনার পাশে দাঁড়িয়েছেন সালমান খান, পরিণীতি চোপড়া ও পাকিস্তানি অভিনেতা আলী জাফর। আলী জাফর মানুষের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

সালমানও প্রশ্ন তোলেন, কারও ওজন, চেহারা, পরিবার, সিনেমা ফ্লপ কিংবা মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রল করার প্রয়োজন কেন। তাঁর মতে, এ ধরনের মন্তব্য মানুষের পারিবারিক শিক্ষা ও মানসিকতারই প্রতিফলন।

দীপিকার ‘বেবি বাম্প’ নিয়েও প্রশ্ন

রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন ২০১৮ সালে বিয়ে করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের প্রথম সন্তান দুয়া জন্ম নেয়। প্রায় দুই বছর পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের বাবা-মা হন তাঁরা।

প্রথমবার দীপিকার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশের পর শুভকামনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় অস্বস্তিকর আলোচনা। তাঁর ‘বেবি বাম্প’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। কেউ কেউ সেটিকে ‘নকল’ বলেও দাবি করেন।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রণবীরের সঙ্গে ভোট দিতে যাওয়ার সময় দীপিকার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেই আলোচনা আরও বাড়ে। এমনকি তিনি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সাংবাদিক ফায়ে ডি’সুজা তখন দীপিকার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি ভোট দিতে বেরিয়েছেন—নিজের শরীর বা গর্ভাবস্থা নিয়ে কারও মতামত জানতে নয়। তাঁর সেই বক্তব্যে আলিয়া ভাট, পূজা ভাট, শাহিন ভাট ও সোনি রাজদানসহ অনেকেই সমর্থন জানান।

দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরও একই ধরনের আলোচনা ফিরে আসে। এবার কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরসিয়া মোরজানি দীপিকার পাশে দাঁড়ান; তাঁর পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানান অভিনেত্রী নিজেও।

দুই সন্তানের বয়সের ব্যবধান নিয়েও পরে প্রশ্ন ওঠে। অথচ সন্তান নেওয়া মূলত স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্ত। তবু গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে সন্তানের বয়সের ব্যবধান—আলোচনার বড় অংশই যেন মায়ের দিকেই গিয়ে ঠেকে।

একই অন্তরঙ্গ দৃশ্য, প্রশ্ন শুধু কিয়ারাকে কেন?

‘টক্সিক’ ছবির ‘তবাহী’ গানে কিয়ারা আদভানি ও যশের অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু সমালোচনার একটি বড় অংশ সিনেমার দৃশ্য ছাড়িয়ে কিয়ারার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে চলে যায়।

কিয়ারা বিবাহিত এবং সন্তানের মা—এই বিষয়টি টেনে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এমন দৃশ্যে তাঁর অভিনয় করা উচিত কি না। কেউ এমনও প্রশ্ন করেন, সিদ্ধার্থ মালহোত্রা কীভাবে তাঁকে এ ধরনের দৃশ্যে অভিনয়ের অনুমতি দিয়েছেন।

কিন্তু একই দৃশ্যে কিয়ারার সঙ্গে ছিলেন যশও। তিনিও বিবাহিত এবং এক কন্যাসন্তানের বাবা। তবু ব্যক্তিগত জীবন টেনে আক্রমণের বড় অংশ গেছে কিয়ারার দিকেই।

অভিনেত্রী হুমা কুরেশি কিয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে এমন প্রতিক্রিয়াকে সমালোচনা করেন। যশও জানিয়েছেন, দর্শকের একাংশ দৃশ্যগুলো সঠিক প্রেক্ষাপটে দেখেননি।

টালিউড অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ও প্রশ্ন তুলেছেন—বিয়ে ও মাতৃত্বের পর একজন নারী শিল্পীর কাছ থেকে কেন নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রত্যাশা করা হবে?

সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনা হলেই ‘বুড়ি’

সাইফ আলী খান ও কারিনা কাপুর দুজনই দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। বয়সের সঙ্গে দুজনের চেহারা ও শরীরে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। সাইফ নিজেও ৫০ বছর বয়সের পর শরীর ও জীবনযাত্রায় আসা পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন।

কিন্তু কারিনাকে বয়স ও চেহারা নিয়ে বারবার কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২২ সালে তাঁর যোগব্যায়ামের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বলিরেখা ও চেহারা নিয়ে মন্তব্য করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশ। কেউ কেউ তাঁকে ‘বুড়ি’ বলেও কটাক্ষ করেন।

এর জবাবে কারিনা প্রশ্ন তুলেছিলেন, বয়সে বড় হওয়াকে কেন অপমান হিসেবে দেখা হবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতাও বাড়ে।

এখানেই বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন পুরুষ অভিনেতার চুলে পাক ধরা কিংবা মুখে বয়সের ছাপ পড়াকে প্রায়ই পরিণত বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। একই পরিবর্তন নারী অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে চেহারা নিয়ে কটাক্ষের কারণ।

মা হওয়ার ‘সময়’ নিয়েও প্রশ্ন শুনেছেন আলিয়া

রণবীর কাপুরকে বিয়ের কয়েক মাস পর ২০২২ সালে কন্যাসন্তান রাহার জন্ম দেন আলিয়া ভাট। তখন ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময় পার করছিলেন অভিনেত্রী। মা হওয়ার খবর প্রকাশের পর শুভেচ্ছার পাশাপাশি তাঁকে শুনতে হয় নানা প্রশ্ন।

কেন ক্যারিয়ারের এমন সময়ে মা হলেন—এমন প্রশ্নও ওঠে। কেউ বলেন, তিনি ‘তাড়াহুড়া’ করেছেন; কেউ আবার আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে তাঁর অভিনয়জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আলিয়া পরে এসব সমালোচনার জবাব দেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, সন্তান হওয়ার কারণে তাঁর পেশাগত জীবন কেন বদলে যাবে?

অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে আলিয়া কাজ থেকে বিরতি নেবেন—এমন খবরের পর তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “আমি একজন নারী, কোনো পার্সেল নই।”

রণবীরও একই সময়ে বাবা হয়েছেন এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল দুজনেরই। তবু জনপরিসরের আলোচনায় আলিয়ার ক্যারিয়ার এবং তিনি কখন মা হলেন—এই প্রশ্নই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

বিরাটের ব্যর্থতার দায়ও কেন আনুশকার?

বিরাট কোহলি ও আনুশকা শর্মা তাঁদের সন্তানদের প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবন ও সন্তানদের গোপনীয়তা রক্ষার ইচ্ছার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

তারপরও তাঁদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য হয়েছে। এমনকি বিরাটের বিদেশে বেশি সময় কাটানোর সিদ্ধান্তের পেছনেও আনুশকার প্রভাব রয়েছে—এমন দাবি করেছেন কেউ কেউ।

বিরাটের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে খারাপ সময় গেলেও একাধিকবার ট্রলের নিশানায় পড়েছেন আনুশকা। মাঠে বিরাটের ব্যর্থতার জন্যও তাঁকে দায়ী করা হয়েছে—যদিও একজন ক্রিকেটারের মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

কেন একই ঘটনায় দুই ধরনের মাপকাঠি?

ঘটনা আলাদা, তারকারাও আলাদা। কোথাও বিষয় চেহারা ও বয়স, কোথাও মাতৃত্ব, কোথাও পেশাগত সিদ্ধান্ত; আবার কোথাও স্বামীর ক্যারিয়ার কিংবা পরিবারের যৌথ সিদ্ধান্ত। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—সমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন নারী।

একজন নারী তারকার শরীর বদলালে প্রশ্ন ওঠে। মা হলে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা হয়। বিবাহিত হওয়ার পর অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করলে ব্যক্তিগত জীবন টেনে আনা হয়। বয়স বাড়লে চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করা হয়। এমনকি স্বামীর ক্যারিয়ারে খারাপ সময় এলেও তার দায় এসে পড়ে স্ত্রীর ওপর।

অন্যদিকে একই ধরনের পরিবর্তন বা সিদ্ধান্ত পুরুষ তারকার ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়।

বিয়ে বা সন্তান হওয়ার পর একজন অভিনেত্রীর শরীর বদলাতে পারে। বয়সের সঙ্গে তাঁর চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার পরও নিজের পেশায় আগের মতোই কাজ করতে পারেন। এসবই স্বাভাবিক জীবনের অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তারকাদের সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের প্রবণতাও বেড়েছে। আর নারী তারকার ক্ষেত্রে সেই হস্তক্ষেপ অনেক সময় শরীর, বয়স, মাতৃত্ব ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বলিউডের এসব ঘটনা তাই শুধু কয়েকজন অভিনেত্রীর ট্রল হওয়ার গল্প নয়। এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও পুরুষ তারকাকে দেখার ক্ষেত্রে এখনো থাকা ভিন্ন প্রত্যাশা ও ভিন্ন মাপকাঠি নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three